‘লজিংবাড়ি’ হুমায়ূন কবীর ঢালীর একটি স্মৃতিনির্ভর ও জীবনঘনিষ্ঠ গ্রন্থ, যেখানে হারিয়ে যেতে বসা লজিংবাড়ি ও লজিংমাস্টার প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক সময়ের সামাজিক জীবনের ছবি উঠে এসেছে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে ‘লজিংবাড়ি’ বা ‘লজিংমাস্টার’ শব্দ দুটি অনেকটাই অপরিচিত। এখনকার শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট টিউটর বা কোচিং শিক্ষকের সঙ্গে বেশি পরিচিত হলেও একসময় শহর ও গ্রাম—উভয় জায়গাতেই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি কোনো পরিবারের বাড়িতে থেকে শিক্ষালাভের প্রচলন ছিল।
লেখক নিজেও স্কুল ও কলেজজীবনে লজিং থেকে পড়াশোনা করেছেন। ফলে লজিংজীবন তাঁর কাছে কেবল একটি পুরোনো সামাজিক প্রথা নয়; এটি তাঁর নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। সেই সময়ের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কৌতুক এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা ঘটনা তাঁর স্মৃতিতে জমা হয়েছে। ‘লজিংবাড়ি’ মূলত সেই অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিরই সাহিত্যিক রূপ।
লজিংবাড়ির সঙ্গে যুক্ত পরিবার, শিক্ষার্থী ও আশপাশের মানুষের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে একটি হারিয়ে যাওয়া সময়ের সামাজিক পরিবেশও ফুটে ওঠে। পড়াশোনার পাশাপাশি একটি পরিবারের সদস্য হয়ে ওঠা, তাদের সঙ্গে জীবনযাপন করা এবং নানা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বড় হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা বইটির কাহিনিকে করেছে আন্তরিক ও মানবিক।
এই গ্রন্থের অন্যতম আকর্ষণ হলো এর স্মৃতিময়তা। লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে একটি সময়ের শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কৃতির চিত্র মিলেমিশে গেছে। পুরোনো সেই লজিংজীবন আজকের পাঠকের কাছে যেমন নস্টালজিয়ার জন্ম দিতে পারে, তেমনি নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে একটি প্রায় বিস্মৃত সামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গে।
‘লজিংবাড়ি’ তাই শুধু কয়েকটি ঘটনার সংকলন নয়; এটি লেখকের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের সামাজিক স্মৃতিকে ধরে রাখার আন্তরিক প্রয়াস।